জলবায়ুসংক্রান্ত উদ্বেগের মাঝে বিশ্বব্যাপী নতুন উদ্ভাবনের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ছে। এর ধারাবাহিকতায় দেশে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতাও বেড়েছে। জলবায়ুসংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান এম্বারের প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি বছরে প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) প্রথমবারের মতো বিশ্বের বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। এতে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে জনসংখ্যাবহুল এশিয়ার দুই দেশ চীন ও ভারত। বিশ্লেষকরা বলছেন, নবায়নযোগ্য খাতের এ সাফল্য বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
সারা বিশ্বেই বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। বর্ধিত চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নবায়নযোগ্য খাত থেকে গ্রিডে যুক্ত হওয়া বিদ্যুৎ। প্রতিবেদন অনুসারে, বছরের প্রথমার্ধে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাড়তি চাহিদাকে অতিক্রম করে গেছে নবায়নযোগ্য খাতগুলো। এ সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ও গ্যাসের ব্যবহার সামান্য কমেছে।
একসময় প্রচলিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রতিস্থাপনে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতে বড় বাধা ছিল অতিরিক্ত ব্যয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ প্রযুক্তি অনেক বেশি ব্যয়সাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছে এম্বার। সংস্থাটি বলছে, নবায়নযোগ্য উৎস এখন শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, অর্থনৈতিকভাবেও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। এ কারণেই খাতটি প্রথমবারের মতো কয়লাকে ছাড়িয়ে যেতে পেরেছে।
নবায়নযোগ্য খাতের মধ্যে চলতি বছরের প্রথমার্ধে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন। ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, যা বিশ্বে বর্ধিত বিদ্যুৎ চাহিদার ৮৩ শতাংশ পূরণ করেছে। অন্যদিকে বায়ুবিদ্যুতের সম্প্রসারণ হয়েছে ৭ শতাংশ। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রথমবারের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি উৎসকে ছাড়িয়ে গেছে।
নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতের সম্প্রসারণের কারণ সম্পর্কে বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়লা ও গ্যাসের দামে অস্থিরতা ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর আন্তর্জাতিক চাপ দেশগুলোকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে ঠেলে দিয়েছে। এছাড়া অনেক দেশ নবায়নযোগ্য প্রকল্পে করছাড়, ভর্তুকি ও বিনিয়োগ প্রণোদনা দিচ্ছে, যা খাতটির দ্রুত সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া আধুনিক ব্যাটারি ও গ্রিড প্রযুক্তি সৌর এবং বায়ুবিদ্যুৎ সংরক্ষণ ও বিতরণ সহজ করেছে।
এম্বারের বিদ্যুৎ বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ও প্রতিবেদনের লেখক মালগরযাটা উইত্রোস-মোটিকা বলেন, ‘নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের এ অর্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা। বিশ্বের বিদ্যুৎ চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ খাত এখন যথেষ্ট দ্রুতগতিতে সম্প্রসারণ হচ্ছে। এটি পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ খাতে এমন একটি পরিবর্তনের শুরু, যেখানে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় করা সম্ভব হচ্ছে।’
পরিবেশগত প্রভাবের কারণে জ্বালানির উৎস হিসেবে সবচেয়ে দূষিত হিসেবে বিবেচিত হয় কয়লা। এর বিকল্প হিসেবেই বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন ও ভারত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতের সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এখনো বেশি।
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) পৃথক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলতি দশকের শেষের দিকে বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্বিগুণের বেশি হতে পারে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা যোগ করবে সৌর প্যানেলগুলো।
আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল বলেন, ‘ভবিষ্যতে বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতে সক্ষমতার বৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা পালন করবে সোলার পিভি। এর সঙ্গে বায়ু, জলবিদ্যুৎ, জৈব জ্বালানি ও ভূতাপীয় শক্তিও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।’
সোলার পিভি বা সোলার ফটোভোলটাইক হলো সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রযুক্তি, যেখানে সূর্যের আলোকে সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয়। এ প্রযুক্তি এখন নিম্ন আয়ের অনেক দেশে দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছে।
সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুসারে, নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ক্ষেত্রে চলতি দশকের শেষ নাগাদ বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজারের অবস্থান ধরে রাখবে চীন। একই সময় দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার হিসেবে উদীয়মান হবে ভারত।
ফাতিহ বিরোল আরো বলেন, ‘প্রতিষ্ঠিত বাজারগুলোর পাশাপাশি সৌদি আরব, পাকিস্তান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার ব্যাপক বাড়বে।’
এম্বারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জানুয়ারি-জুনে চীন একাই নিজস্ব গ্রিডে বাকি বিশ্বের সম্মিলিত উৎপাদনের চেয়ে বেশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যোগ করেছে। এ ছয় মাসে ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় দেশটিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ২ শতাংশ কমেছে। একই সময় ভারতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে এর চাহিদার তিনগুণ। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ও গ্যাসের ব্যবহার যথাক্রমে ৩ দশমিক ১ ও ৩৪ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ চাহিদা নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে। এতে বছরের প্রথমার্ধে দেশটিতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে ১৭ শতাংশ।
একই সময়ের চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির হার কম ছিল ইউরোপে। মহাদেশটিতে আবহাওয়াসংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছে বায়ু ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো। তবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও তা গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ খাতে প্রবৃদ্ধি রোধ করতে পারেনি। ফলে ইউরোপে গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে যথাক্রমে ১৪ ও ১ দশমিক ১ শতাংশ।